হাম বা মিজলস একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ যা বিশ্বের ইতিহাসে লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ নিয়েছে। বিজ্ঞানের অগ্রগতি এবং টিকা আবিষ্কারের মাধ্যমে এই রোগকে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। হামের ভাইরাসের বৈজ্ঞানিক নাম মিজলস মরবিলিভাইরাস (Measles morbillivirus), যা প্যারামিক্সোভিরিডি পরিবারের মরবিলিভাইরাস গণের সদস্য। এটি একটি আরএনএ ভাইরাস এবং বায়ুবাহিত পথে ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত ব্যক্তি ঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার দুই ঘণ্টা পরেও বাতাসে ভাইরাসটি সক্রিয় থাকতে পারে।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে গরুর রিন্ডারপেস্ট ভাইরাস বিবর্তিত হয়ে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে এবং হাম ভাইরাসের উৎপত্তি ঘটায়। দশম শতাব্দীতে পারস্যের বিজ্ঞানী আল-রাজি প্রথম হাম ও গুটিবসন্তকে আলাদা রোগ হিসেবে চিহ্নিত করেন। ১৮৪৬ সালে ফারো আইল্যান্ডে ডাক্তার পিটার প্যানাম আবিষ্কার করেন যে, একবার হামে আক্রান্ত হয়ে বেঁচে যাওয়া মানুষ আজীবন রোগ-প্রতিরোধী (লাইফটাইম ইমিউনিটি) হয়ে যায়, যা পরবর্তীকালে টিকা গবেষণার ভিত্তি হয়ে ওঠে।
১৯৫৪ সালে হার্ভার্ডের বিজ্ঞানী জন এন্ডার্স এবং থমাস পিবলস প্রথমবার ল্যাবরেটরিতে হাম ভাইরাস আলাদা করতে সক্ষম হন। ১৯৬৩ সালে বিজ্ঞানী মরিস হিলম্যান তাঁর অসুস্থ মেয়ে জেরিল লিনের শরীর থেকে সংগৃহীত ভাইরাস মুরগির ভ্রূণে বারবার কালচার করে দুর্বল করেন (অ্যাটেনুয়েশন প্রক্রিয়া) এবং লাইভ অ্যাটেনুয়েটেড ভ্যাকসিন তৈরি করেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি অনুযায়ী হামের টিকা দুই ডোজে দেওয়া হয়: প্রথম ডোজ ৯ মাস বয়সে এবং দ্বিতীয় ডোজ ১৫ মাস বয়সে।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য (পরীক্ষার জন্য)
- রোগের নাম: হাম বা মিজলস
- ভাইরাসের বৈজ্ঞানিক নাম: মিজলস মরবিলিভাইরাস (Measles morbillivirus)
- পরিবার: প্যারামিক্সোভিরিডি (Paramyxoviridae)
- গণ: মরবিলিভাইরাস (Morbillivirus)
- ভাইরাসের ধরন: আরএনএ ভাইরাস
- উৎপত্তি: গরুর রিন্ডারপেস্ট ভাইরাস থেকে বিবর্তিত (প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে); এটি একটি জুনোটিক রোগ
- প্রথম পার্থক্যকারী: আল-রাজি (পারস্য, দশম শতাব্দী) — হাম ও গুটিবসন্তকে আলাদা রোগ হিসেবে চিহ্নিত করেন
- লাইফটাইম ইমিউনিটি আবিষ্কার: ডাক্তার পিটার প্যানাম, ১৮৪৬ সালে ফারো আইল্যান্ডে
- ভাইরাস আলাদাকরণ: জন এন্ডার্স ও থমাস পিবলস, ১৯৫৪ সালে হার্ভার্ডে
- টিকা আবিষ্কারক: মরিস হিলম্যান, ১৯৬৩ সালে
- টিকার ধরন: লাইভ অ্যাটেনুয়েটেড ভ্যাকসিন
- টিকা প্রক্রিয়া: অ্যাটেনুয়েশন (মুরগির ভ্রূণে বারবার কালচার করে ভাইরাস দুর্বল করা)
- হামের সিগনেচার লক্ষণ: কপলিক স্পট (গালের ভেতরে লবণের দানার মতো দাগ)
- টিকার ডোজ: প্রথম ডোজ ৯ মাসে, দ্বিতীয় ডোজ ১৫ মাসে (MR টিকা)
- বায়ুবাহিত সক্রিয়তা: আক্রান্ত ব্যক্তি ঘর ছাড়ার ২ ঘণ্টা পরও বাতাসে ভাইরাস সক্রিয় থাকে
- ঝুঁকি বৃদ্ধিকারী উপাদান: ভিটামিন এ-এর অভাব
- সংস্থা: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), বাংলাদেশ সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI)
সম্ভাব্য প্রশ্ন ও উত্তর
প্রশ্ন: হামের ভাইরাসের বৈজ্ঞানিক নাম কী?
উত্তর: মিজলস মরবিলিভাইরাস (Measles morbillivirus)
প্রশ্ন: হাম ভাইরাস কোন পরিবারের অন্তর্গত?
উত্তর: প্যারামিক্সোভিরিডি (Paramyxoviridae) পরিবারের
প্রশ্ন: হাম ভাইরাস কোন ধরনের ভাইরাস?
উত্তর: আরএনএ ভাইরাস
প্রশ্ন: হাম ভাইরাস কোন প্রাণীর ভাইরাস থেকে উদ্ভূত হয়েছে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন?
উত্তর: গরুর রিন্ডারপেস্ট ভাইরাস থেকে
প্রশ্ন: জুনোটিক রোগ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: যে রোগ অন্য প্রাণী থেকে মানুষের দেহে আসে
প্রশ্ন: হাম ও গুটিবসন্তকে প্রথম আলাদা রোগ হিসেবে কে চিহ্নিত করেন?
উত্তর: পারস্যের বিজ্ঞানী আল-রাজি, দশম শতাব্দীতে
প্রশ্ন: ফারো আইল্যান্ডে হামের মহামারিতে লাইফটাইম ইমিউনিটি আবিষ্কার করেন কে?
উত্তর: ডাক্তার পিটার প্যানাম, ১৮৪৬ সালে
প্রশ্ন: প্রথমবার ল্যাবরেটরিতে হাম ভাইরাস আলাদা করেন কারা?
উত্তর: জন এন্ডার্স ও থমাস পিবলস, ১৯৫৪ সালে হার্ভার্ডে
প্রশ্ন: হামের টিকা কে আবিষ্কার করেন এবং কত সালে?
উত্তর: মরিস হিলম্যান, ১৯৬৩ সালে
প্রশ্ন: হামের টিকায় কোন প্রক্রিয়ায় ভাইরাসকে দুর্বল করা হয়?
উত্তর: অ্যাটেনুয়েশন (মুরগির ভ্রূণের কোষে বারবার কালচার করে)
প্রশ্ন: হামের সিগনেচার বা নিজস্ব লক্ষণ কী?
উত্তর: কপলিক স্পট — গালের ভেতরে লবণের দানার মতো ছোট ছোট দাগ
প্রশ্ন: বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে হামের প্রথম ডোজ কখন দেওয়া হয়?
উত্তর: শিশুর বয়স ৯ মাস পূর্ণ হলে
প্রশ্ন: হামের দ্বিতীয় ডোজ টিকা কখন দেওয়া হয়?
উত্তর: শিশুর বয়স ১৫ মাস পূর্ণ হলে
প্রশ্ন: আক্রান্ত ব্যক্তি ঘর ছেড়ে যাওয়ার কতক্ষণ পরও হাম ভাইরাস বাতাসে সক্রিয় থাকতে পারে?
উত্তর: ২ ঘণ্টা পর্যন্ত
প্রশ্ন: কোন ভিটামিনের অভাবে শিশুদের হামে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে?
উত্তর: ভিটামিন এ
প্রশ্ন: হার্ড ইমিউনিটি বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: সমাজের বেশিরভাগ মানুষ টিকা বা পূর্ববর্তী সংক্রমণের মাধ্যমে রোগ-প্রতিরোধী হলে পুরো সমাজে রোগ ছড়ানোর প্রবণতা কমে যাওয়াকে হার্ড ইমিউনিটি বলে
প্রশ্ন: হামের টিকার ধরন কী?
উত্তর: লাইভ অ্যাটেনুয়েটেড ভ্যাকসিন
প্রশ্ন: ভ্যাকসিন হেজিটেন্সি কী?
উত্তর: টিকা নিয়ে মানুষের মনে থাকা ভুল ধারণা বা ভয়, যার কারণে মানুষ টিকা নিতে অনীহা দেখায়
MCQ অনুশীলন
প্রশ্ন: হামের ভাইরাস কোন গণের (Genus) অন্তর্গত?
ক) অর্থোমিক্সোভাইরাস খ) মরবিলিভাইরাস গ) ফ্লাভিভাইরাস ঘ) কোরোনাভাইরাস
সঠিক উত্তর: খ) মরবিলিভাইরাস
প্রশ্ন: ফারো আইল্যান্ডে হামের মহামারি কত সালে হয়েছিল?
ক) ১৭৮৪ খ) ১৮৪৬ গ) ১৯১৮ ঘ) ১৯৫৪
সঠিক উত্তর: খ) ১৮৪৬
প্রশ্ন: মরিস হিলম্যান কোন উপাদান ব্যবহার করে হামের ভাইরাসকে দুর্বল করেছিলেন?
ক) ব্যাঙের ভ্রূণের কোষ খ) শূকরের ভ্রূণের কোষ গ) মুরগির ভ্রূণের কোষ ঘ) ইঁদুরের ভ্রূণের কোষ
সঠিক উত্তর: গ) মুরগির ভ্রূণের কোষ
প্রশ্ন: নিচের কোনটি হামের নিজস্ব সিগনেচার লক্ষণ?
ক) ত্বকে পানিভরা ফোসকা খ) গালের ভেতরে কপলিক স্পট গ) গলায় সাদা আবরণ ঘ) চোখের পাতায় দানা
সঠিক উত্তর: খ) গালের ভেতরে কপলিক স্পট
প্রশ্ন: বাংলাদেশে হামের টিকার প্রথম ডোজ কোন বয়সে দেওয়া হয়?
ক) ৬ মাস বয়সে খ) ৯ মাস বয়সে গ) ১২ মাস বয়সে ঘ) ১৮ মাস বয়সে
সঠিক উত্তর: খ) ৯ মাস বয়সে
প্রশ্ন: হাম ভাইরাসকে কেন জুনোটিক রোগ বলা হয়?
ক) এটি মশার মাধ্যমে ছড়ায় খ) এটি মাটি থেকে উৎপন্ন হয়েছে গ) এটি অন্য প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে এসেছে ঘ) এটি কেবল শিশুদের আক্রমণ করে
সঠিক উত্তর: গ) এটি অন্য প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে এসেছে
প্রশ্ন: ১৯৫৪ সালে হার্ভার্ডে হাম ভাইরাস আলাদা করার কাজে কোন বিজ্ঞানী নেতৃত্ব দেন?
ক) মরিস হিলম্যান খ) পিটার প্যানাম গ) জন এন্ডার্স ঘ) আল-রাজি
সঠিক উত্তর: গ) জন এন্ডার্স